হোম / অর্থনীতি-সংবাদ / জাতীয় অর্থনীতিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে কাপ্তাই হ্রদ
D.Fishermen pic-1

জাতীয় অর্থনীতিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে কাপ্তাই হ্রদ

মঈন উদ্দীন বাপ্পী, রাঙ্গামাটি
এশিয়া মহাদেশের মানব সৃষ্ট সর্ববৃহৎ মিঠা পানির হ্রদ রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদ। ১৯৬৩-৬৪ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার জল বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষে বাঁধ দেওয়ার ফলে মানব সৃষ্ট এ হ্রদের সৃষ্ঠি হয়। সেই সময়ে বাঁধ দেওয়ার ফলে তৎকালীন হাজার মানুষকে উদ্ভাস্ত হতে হয়েছে। কিন্তু এ হ্রদ থেকে বিদুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি সৃষ্টি হয় মাছ উৎপাদনের বিশাল বানিজ্যিক খাত। হ্রদে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে মৎস্য ব্যবসায়ী ও জেলেদের সংখ্যা বিপুল হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ হৃদের মৎস্য খাত বর্তমানে জেলার মানুষকে অর্থনেতিক মুক্তি দানের পাশপাশি দেশের অর্থনীতিতে বিশাল ভূমিকা রাখছে।
একটা সময় হ্রদ থেকে ৭৫ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। সে সময় বাজারে বিক্রি হতে করা হতো বোয়াল, চিতল, রুই, কাতলা, কালিঘনিয়া, সাদাঘনিয়া, তেলাপিয়া, মহাল, কারপু, টুইট্টা, বাঁডা, মলা-ঢেলা, বড় আকারের চাপিলা, বকরি, ফলাই, বাচকুট্টা, ফাইশ্যা, পাপদা, পুঁটি, বাইন, পুঁইয়া, টেংরা, টাকি, গজাল, সিং, শৈল, কুইচ্ছা, মাগুর, ছোট ইছা, সরপুঁটি, আইল, কেচকি, বাইলাসহ উল্লেখযোগ্য প্রজাতির মাছ।
কিন্তু বিগত দু’ দশক ধরে সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে মাছের সটিক প্রজনন, ডিম ছাড়ার সময় অসাধু ব্যবসায়ী ও কর্পোরেশনের কর্মকর্তাদের যোগসাজসে মাছ শিকার করে গোপনে বাজারজাত করায় ধীরে ধীরে মাছের ওজন এবং উল্লেযোগ্য প্রজাতিগুলো দিনদিন বিলুপ্ত হতে যাচ্ছে। ১৯৮৮-৮৯ সালের দিকে প্রথমে মৎস্য প্রজাতি বিলুপ্তি প্রকাশ পায়। প্রায় দু’দশক পর দেখা যাচ্ছে হৃদ থেকে প্রায় ৩৭ প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়েছে এবং আরো অনেক সুস্বাধু মাছ এখন বিলুপ্তির পথে এবং দুই প্রজাতির কচ্ছপ অনেক আগে বিলুপ্তি হয়েছে। মৎস্য গবেষণা সূত্রে জানা গেছে, সীলন, দেশি সরপুঁটি, ঘাউরা,বাঘাইড়, মোহিনী বাটা, দেশি পাংগাস মাছগুলো সম্প্রতি কাপ্তাই হ্রদ হতে বিলীন হয়ে গেছে।
সচেতন বিজ্ঞমহলরা বারবার অভিযোগ করে বলছেন, বৃহৎ এ হ্রদ নিয়ে কারো মাথা ব্যাথা নেই। প্রজনন ও ডিম ছাড়ার সময় মাছ শিকার নিষেধ থাকলেও অসৎ ব্যবসায়ীরা রাতের আঁধারে মাছ শিকার করে সড়ক পথেই তা পাচার করে। অব্যবস্থাপনার কারণে এ সময় ডিমওয়ালা মাছ শিকার এবং বিক্রি করায় আজকে হ্রদের আকার বড় থাকলেও মাছের পরিমাণ কমে আসছে। তাছাড়া হ্রদ ঘিরে অবৈধ দখলবাজদের কারণে হ্রদের পরিধি দিন দিন ছোট হয়ে আসছে। পয়:নিষ্কাশনের কারণে বাড়ছে দূষণ। একটা সময় হ্রদে মাছের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেও ৯৫-৯৬’র শেষের দিকে এসে মাছের পমিাণ কমতে থাকে।
শহরের বনরূপা বাজারে মাছ কিনতে আসা সরকারি চাকরীজিবী সাজিয়া পারভীন নামের এক ক্রেতা জানান, নিজেদের হ্রদের মাছ কিনতে হচ্ছে চট্টগ্রাম-ঢাকার বাজার দরে। একটা সময়ে প্রতি কেজি কেচকি ৫-৬ টাকায় পাওয়া গেলেও এখন সে মাছ কিনতে হচ্চে ২শত টাকার উপরে। ২০-৩০ টাকার চাপিলা এখন দুই থেকে আড়াইশত টাকা বিক্রি হচ্ছে। প্রত্যেক মাছ কিনতে হচ্ছে চড়া দামে।
মাছ ক্রেতা জব্বার জানান,ব্যবসায়ীরা শহরে স্থানীয়দের কাছে কম দামে মাছ বিক্রির নামে সরকারি কর (রয়েলটি) ফাঁকি দিয়ে যাচ্ছে। অধিকাংশ মাছই চট্টগ্রাম-ঢাকাসহ অন্যান্য জেলাতে রপ্তানি করা হচ্ছে অথচ নিজ শহরের চাহিদা মেটানোর পর উদ্ধৃত মৎস্য জেলার বাইরে বিক্রয়ের আদেশ রয়েছে বলেও তারা দাবি করেন।
শহরের মৎস্য ব্যবসায়ীরা ক্ষোভের সাথে অভিযোগ করে বলেন, অতীতে মৎস্য কর্পোরেশন অনভিজ্ঞদের ব্যবসার লাইসেন্স দিয়েছিলো। একজন মৎস্য ব্যবসায়ীকে সরকারি লাইসেন্স পেতে কি কি থাকা দরকার তার প্রয়োজনও মনে করেননি কর্পোরেশন। যার ফলে অনভিজ্ঞ ব্যবসায়ীরা মানেননি কোন নিয়ম কানুন। একটা সময় এ হৃদে বিভিন্ন প্রজাতির ও ওজন ওয়ালা মাছ পাওয়া গেলেও এখন তা দুষ্কর। কারন হিসেবে তারা জানান, মাছ শিকারে অজ্ঞতা, জেলেদের সঠিক প্রশিক্ষণ না থাকা, প্রতিষ্টানিক শিক্ষা না থাকা,অর্থাভাব, প্রশাসনিক অসচেতনতা,উন্নত গবেষনার অভাবে একদিকে যেমন সুস্বাদু মাছের পরিমাণের কমে আসছে ঠিক অন্যদিকে রাক্ষুসে মাছের পরিমাণ দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জেলা মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশন এর ব্যবস্থাপক ও প্রজেক্ট ডিরেক্টর কমান্ডার মাইনুল ইসলাম (সি) বিএন তিনি বলেন, তার দায়িত্বের অধীনে ২০১৩- ১৪ অর্থ বছরে মৎস্য আহরিত হয়েছে ৮৮১৩ মে.টন এবং রাজস্ব আদায় হয়েছে ৭ কোটি ৩৪ লক্ষ টাকারও বেশি, ২০১৪- ২০১৫ আহরিত মৎস্য ৮৬৪৪.৮০ মে.টন এবং রাজস্ব আদায় ৯ কোটি ৩৫ লক্ষ টাকারও বেশি। এবারের সর্বশেষ ২০১৫-২০১৬ অর্থ বছরে মৎস্য আহরিত হয়েছে ৯৫৮৮.৫৫ মে.টন এবং রাজস্ব আদায় হয়েছে ১০ কোটি ৫৪ লক্ষ টাকারও বেশি। তিনি আরো বলেন, আমাদের এ প্রচেষ্টা অব্যহত থাকলে অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙে রাজস্বের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে বলে তিনি আশ্বাস প্রদান করেন। তিনি জানান, মাছের প্রজনন বৃদ্ধির লক্ষে প্রতি বছর মে মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে তিন মাসের জন্য হ্রদে সকল প্রকার মাছ শিকার নিষিদ্ধ করা হয়। সেই সাথে হ্রদে মাছ যেখানে ডিম ছাড়ে এমন চ্যানেলেগুলোতে কোস্ট গার্ড নিয়োগ করা হয়েছে এবং এই স্থান গুলোকে মাছের অভয়াশ্রম জোন হিসেবে চিহিৃত করা হয়েছে। তিনি হতাশ কন্ঠে বলেন, কার্প জাতীয় মাছ ডিম দিলেও বাচ্চা মাছ ফোটে না ফলে ঘাটতি মেটাতে প্রতিবছর দেশের সমতল এলাকা থেকে পোনা ক্রয় করে হ্রদে ছাড়তে হয়। মাছের অভয়াশ্রম গুলোর বিষয়ে বলেন, কর্পোরেশনের ৭টি অভয়াশ্রম রয়েছে তার মধ্যে ৫টির অবস্থা খুবই ভালো। কর্পোরেশনে লাইসেন্স প্রাপ্ত ব্যবসায়ীর সংখ্যা ৪৬ জন এবং হ্রদ নির্ভর জেলের সংখ্যা প্রায় ২১ হাজার ৫শত জন। মাছ শিকার বন্ধ থাকাকালীন সময়ে এসব জেলেদের সরকার ভিজিএফ এর আওতায় অন্তর্ভুক্ত করে। তিনি বলেন, হ্রদের মৎস্য সম্পদকে রক্ষা ও দূষণ মুক্ত রাখার জন্য হ্রদকে ড্রেজিংয়ের আওতায় আনতে হবে। পাশাপশি অবৈধ দখল থেকে হ্রদ যাতে সুরক্ষা থাকে সেদিকে স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি বাড়াতে হবে।
মৎস্য গবেষনা ইনষ্টিটিউট এর উর্দ্ধতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা একেএম সাইফুল ইসলাম জানান, এশিয়া মহাদেশের মানব সৃষ্ট বৃহৎ মিঠা পানির এ হ্রদে বহু প্রজাতীর মাছের ভান্ডার। বিলুপ্ত মাছের পরিপূর্নতা আনতে হলে প্রজনন ও ডিম ছাড়ার সময় যে তিন মাস মাছ শিকার বন্ধ রাখা হচ্ছে তা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ভুলক্রমে বৃহৎ এ হ্রদে আট প্রজাতীর বিদেশী রাক্ষুসে মাছ সংযোজিত হয়েছে যেমন ঘ্রাসকাপ্ট, সিলভার কাপ, কারফিউ রাজপূঁটি, তেলাপিয়া নাইলটিকা, তেলাপিয়া মোজাম্বীকা, থাই মহাশুর,আফ্রিকান মাগুর ও থাই পাঙ্গাস। যা অন্য প্রজাতির মাছ উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে এ প্রজাতির মাছগুলো। তিনি জানান, হ্রদে মাছের ডিমছাড়ার ৪টি গুরুত্বপূর্ন স্থান গুলো হলো কাচালং চ্যানেলের মাইনীমূখ ও তৎউর্দ্ধো এলাকা, বরকল চ্যানেলের জগন্নাথছড়ি ও তৎউর্দ্ধো এলাকা, নানিয়ারচর চেঙ্গী চ্যানেল ও তৎউর্দ্ধো এলাকা, বিলাইছড়ি চিংখং চ্যানেল ও তৎউর্দ্ধো এলাকা। এসব স্থানগুলো মাছের ডিম ছাড়ার গুরুত্বপূর্ন স্থান। প্রত্যকেরই উচিত দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে এসব চ্যানেল গুলোকে রক্ষা করা। হ্রদে ড্রেজিং নয় প্রয়োজন ভারতের রাবার ড্যামগুলোর দিকে নজর রাখা যাতে নিয়মিত পানি আসে।
মৎস্য উন্নয়ন প্রকল্পের উপ-পরিচালক আব্দুর রহমান মিয়া বলেন, মৎস্য খাতে আয় বৃদ্ধি এবং অভাব মোচনের জন্য ৩কোটি ৩৭ লক্ষ টাকার ২টি প্রজেক্টের কাজ শেষ হতে চলেছে । এর মধ্যে ১টি এ সংক্রান্ত বিষয়ে জেলে ও ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা। তিনি জানান রাঙ্গামাটি,খাগড়াছড়ি-মহালছড়ি ও দীঘিনালা উপজেলাসহ এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৮শত ৪০ জন জেলে ও ব্যবসায়ীকে ইতিমধ্যেই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও সিএইচটি প্রজেক্টের ৩য় পর্যায়ের প্রায় ৬৮ কোটি টাকায় ৬২৬টি ক্রীক উন্নয়নের কাজ চলছে এদের মধ্যে রাঙ্গামাটিতে ২৯৮, বান্দরবানে ১৮৭ ও খাগড়াছড়িতে ৩২৯টি সহ মোট ৮০৪টি এবং ৩০ কোটি টাকায় টেন্ডারের মাধ্যমে ৫৩০টির কার্যাদেশ প্রদান করা হলেও ৪০০টির কাজ সম্পূর্ন হয়ে গেছে এবং প্রতি বছর অন্তত ১৩০ কেজি রেনু উৎপাদনের লক্ষ্যে খাগড়াছেিত ১টি হেচারীও নির্মান করা হচ্ছে। তিনি বলেন এ প্রজেক্ট সুফল ভোগীদের ক্রীকের মাধ্যমে শুধু মাছ চাষ নয় সেখানে জমিতে সেচ এবং গৃহস্থালী কাজের পানি ব্যবহারের প্রজেক্টও রয়েছে। ক্রীকের মাধ্যমে মাছ চাষে সুফলভোগী ৬ হাজার ব্যাক্তিকে ইতিমধ্যেই প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

আরও দেখুন

05-

আত্মহত্যা করলেন মডেল সাবিরা

স্টাফ রিপোর্টার : চলতি প্রজন্মের মডেল সাবিরা হোসাইন আত্মহত্যা করেছেন। মঙ্গলবার ভোর ৫টার মিরপুরের রূপনগরে ...

Leave a Reply

%d bloggers like this: