সর্বশেষ সংবাদ
প্রবাসী স্বামীর অনুপস্থিতিতে যুবকের সাথে শারীরিক সম্পর্ক, মেয়ের দিকেও লোলুপ দৃষ্টি বাধ্য হয়ে থানায় প্রবাসীর স্ত্রী গৌরনদীতে দু’পক্ষের সংঘর্ষ, নারীসহ আহত ৮ গোমস্তাপুরে মাদকসহ আটক চার তাইওয়ানে ৬.০ মাত্রার ভূমিকম্প বাবাকে নতুন জীবন দিলেন ১৯ বছরের মেয়ে দুর্যোগ-দুর্ঘটনা মোকাবেলায় ব্যক্তিগত পর্যায়েও সচেতন হতে হবে : প্রধানমন্ত্রী আগামী দিনে সবুজ ও পরিষ্কার শক্তির উৎস সৌরশক্তি : পরিকল্পনামন্ত্রী দারিদ্র বিমোচন সহায়ক বাজেট প্রণয়নের আহ্বান: স্পিকার নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ বক্স রাখার সুপারিশ গ্রেপ্তারকালে পেরুর সাবেক প্রেসিডেন্টের আত্মহত্যা
হোম / জাতীয় / জেলে বসেই রাফি হত্যার নির্দেশ অধ্যক্ষের
Untitled-1

জেলে বসেই রাফি হত্যার নির্দেশ অধ্যক্ষের

সিনিয়র রিপোর্টার:

ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে ওই মাদরাসার অধ্যক্ষ (বর্তমানে বরখাস্ত) এস এম সিরাজ উদ দৌলার নির্দেশে তাঁর অনুসারী ও সহযোগীরা নৃশংসভাবে পুড়িয়ে হত্যা করেছে। এ হত্যাকাণ্ডে এখন পর্যন্ত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ১৩ জনের জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে দুজন নারী। জড়িত এসব ব্যক্তির মধ্যে এ পর্যন্ত সাতজনকে আটক করা হয়েছে।

গতকাল এসব তথ্য জানিয়ে তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) বলেছে, দুটি কারণে রাফিকে হত্যা করা হয়েছে। যৌন নিপীড়নের অভিযোগে অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে মামলা করা এবং শাহাদাত হোসেন শামীমের প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় ক্ষুব্ধ হয়ে এই হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। রাফি হত্যা মামলার গুরুত্বপূর্ণ আসামি নূর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম ও মাকসুদ আলমকে গ্রেপ্তারের পর হত্যার কারণ, পরিকল্পনা ও অংশগ্রহণকারীদের ব্যাপারে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

দুপুরে রাজধানীর ধানমণ্ডিতে পিবিআই সদর দপ্তরে সংস্থার প্রধান পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) বনজ কুমার মজুমদার প্রেস ব্রিফিংয়ে রাফি হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তুলে ধরেন।

সিরাজের নির্দেশেই পরিকল্পনা : বনজ কুমার মজুমদার জানান, গত ৪ এপ্রিল অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার সঙ্গে ফেনী কারাগারে দেখা করে কয়েকজন। তাদের মধ্যে ছিল মাদরাসার ছাত্রলীগের কথিত সভাপতি শাহাদাত হোসেন শামীম, নূর উদ্দিন, জাবেদ হোসেন, হেফজখানার ইনচার্জ হাফেজ আবদুল কাদের। সেখানে সিরাজ তাদের ‘একটা কিছু করে’ রাফিকে ‘শায়েস্তা করার’ এবং ‘থামিয়ে দেওয়ার’ নির্দেশ দেন। এই নির্দেশের পরই শামীম ও নূর উদ্দিন রাফির ওপর হামলার পরিকল্পনা করে।

ছাত্রাবাসে আগের রাতে পরিকল্পনা বনজ কুমার বলেন, সিরাজের নির্দেশ অনুযায়ী ৫ এপ্রিল রাত ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার দিকে মাদরাসার হোস্টেলে একটি বৈঠক করে পাঁচজন। বৈঠকে নূর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, জাবেদ হোসেন ও হাফেজ আব্দুল কাদের ছিল। আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, মাদরাসার অধ্যক্ষ গ্রেপ্তার হওয়ায় পুরো ‘আলেম সমাজ হেয়’ হচ্ছে বলে তারা রাফির ওপর ক্ষিপ্ত ছিল। এ ছাড়া শামীমের প্রেমের প্রস্তাব রাফি একাধিকবার প্রত্যাখ্যান করার কারণে সেও ক্ষিপ্ত ছিল। ওই বৈঠকেই রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার পরিকল্পনা করে তারা। শামীমই রাফিকে পুড়িয়ে দেওয়ার ধারণা দেয়।

কিভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে, সেই বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে তারা আরো পাঁচজনকে তাদের পরিকল্পনার কথা জানায়। যাদের মধ্যে দুজন মেয়েও ছিল। তাদের একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয় তিনটি বোরকা ও কেরোসিন সংগ্রহের জন্য। পরিকল্পনা অনুযায়ী, শাহাদাত হোসেন শামীমের কাছে তিনটি বোরকা ও কেরোসিন সরবরাহ করে মেয়েটি। পরিকল্পনার পরদিন অর্থাৎ ৬ এপ্রিল সকাল ৯টার আগেই বোরকা পরে শামীমসহ তিন পুরুষ শিক্ষার্থী সাইক্লোন শেল্টার কাম মাদরাসা ভবনের ছাদে টয়লেটে লুকিয়ে থাকে। এরপর পরীক্ষা শুরুর কিছুক্ষণ আগে আরেকটি মেয়ে রাফিকে বলে, ছাদে তার বান্ধবী নিশাতকে মারধর করা হচ্ছে। এই খবর শুনেই রাফি ছাদে যায়।

যেভাবে হত্যাকাণ্ড : আটক আসামিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে ঘটনার বিবরণ জানান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার। তিনি বলেন, ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা শুরুর আগে থেকেই ওই মাদরাসায় ঢুকে পড়ে হত্যাকারীরা। সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে দুটি টয়লেটে লুকিয়ে ছিল তারা। চার হত্যাকারীর মধ্যে যে মেয়েটি ছিল সেই মেয়েই বাকি তিনজনকে বোরকা ও কেরোসিন এনে দেয়। দুই মেয়েই মাদরাসার ছাত্রী। ক্লাসের আগে (সকাল ৭টা) পলিথিনে কেরোসিন ও বোরকা নিয়ে মাদরাসায় ঢোকে। আর চম্পা বা শম্পা নামের একটি মেয়ে (পঞ্চম জন) পরীক্ষার হলে গিয়ে রাফিকে বলে তার বান্ধবী নিশাতকে মারধর করা হচ্ছে। এই কথা শুনে রাফি ছাদে যায়। রাফি ছাদে যাওয়ার পরই তারা টয়লেট থেকে বের হয়ে তাকে ঘিরে ধরে। এরপর তাকে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেয়। কথা না শোনায় রাফির হাত বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

বনজ কুমার আরো বলেন, হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া চারজন এবং নুসরাতকে ডেকে ছাদে নিয়ে আসা চম্পা অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর সবার সামনে দিয়েই মাদরাসার মূল ফটক হয়ে পালিয়ে যায়। নূর উদ্দিন ও হাফেজ আব্দুল কাদেরসহ পাঁচজন আগে থেকেই ফটকে পাহারা দিচ্ছিল। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পর সবাই গাঢাকা দেয়।

জানতে চাইলে বনজ কুমার মজুমদার বলেন, ‘হামলায় বা হত্যায় অংশগ্রহণকারীরা শিক্ষার্থী। ছাদে একজন মেয়ে ছিল বলে জানা গেছে। হল থেকে রাফিকে ছাদে ডেকে নিয়ে যায় আরেকটি মেয়ে। এই দুই মেয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। বাকিরা ছেলে। ছাদে শামীম ছিল। বাকিদের ব্যাপারে তথ্য যাচাই এবং গ্রেপ্তার অভিযান চলছে। কোনো সম্পৃক্ততা যার আছে তাকেই আসামি করা হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘রাফি মুমূর্ষ অবস্থায় ওস্তাদ শব্দটি উচ্চারণ করে। মাদরাসা বা হেফজখানার শিক্ষকদের ওস্তাদও বলা হয়।’

হত্যাকাণ্ডে জড়িত দুটি মেয়েকে শনাক্ত করা যায়নি বলে পিবিআই জানিয়েছে। তবে উম্মে সুলতানা পপি নামের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সে অধ্যক্ষ সিরাজের ভায়রার মেয়ে। তবে পপি হত্যাকাণ্ডে জড়িত কি না সেটা নিশ্চিত করেনি পিবিআই।

তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, পলাতক আসামি হাফেজ আব্দুল কাদের ও নির্দেশদাতা অধ্যক্ষ সিরাজের কারণেই সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসায় রাফির ওপর নিপীড়ন এবং হত্যার ঘটনা ঘটেছে। তাদের অনুসারী ছাত্ররা তাদের ওস্তাদ বলে জানে। ওস্তাদের অপমানের প্রতিশোধ নিতে হবে বলে কাদেরও তাদের বোঝায়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রটি আরো জানায়, হত্যার সময় যে নারী তাদের বোরকা ও কেরোসিন দিয়েছিল সে শামীমের ঘনিষ্ঠ। সে পরিকল্পনায় সরাসরি যুক্ত হয়। এখন তাকে শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।

পিবিআই জানিয়েছে, গত শুক্রবার রাতে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থেকে শামীমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, শামীমকে নিয়ে অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

প্রসঙ্গত, মৃত্যুর আগে রাফি যেভাবে তাঁর ওপর হামলার বর্ণনা দিয়েছিল, পিবিআইয়ের তদন্তে তেমন তথ্যই উঠে আসছে। কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ঘটনার আগের রাতে মাদরাসায় গোপন বৈঠকের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছিল। পুলিশ ক্লু নেই দাবি করলেও রাফিকে এক তরুণীর ছাদে ডেকে নিয়ে যাওয়া এবং পরীক্ষার সময় কেন্দ্রের ভেতরে নূর উদ্দিনের উপস্থিতির তথ্য প্রকাশ করেছিল কালের কণ্ঠ।

গ্রেপ্তার যারা : পিবিআই জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত জড়িত যে ১৩ জনের তথ্য পাওয়া গেছে তাদের মধ্যে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলো এস এম সিরাজ উদ দৌলা, তার সহযোগী নূর উদ্দিন ও শামীম, কাউন্সিলর মাকসুদ আলম, জোবায়ের আহমেদ, জাবেদ হোসেন ও  প্রভাষক আফছার উদ্দিন। তবে পিবিআই প্রধান বলেছেন, ‘শাহাদাত হোসেন শামীম এখনো আমাদের হাতে আসেনি।’ রাফির ঘটনায় দুই মামলা মিলে সোনাগাজী থানা পুলিশ ও পিবিআই গতকাল পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।

সাতজন ছাড়া বাকিদের সম্পৃক্ততা আছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গতকাল মামলার ৬ নম্বর আসামি জাবেদকে সাত দিনের রিমান্ড দিয়েছেন ফেনীর মুখ্য বিচার বিভাগীয় হাকিম আদালতের জ্যেষ্ঠ বিচারক সরাফ উদ্দিন। এর আগে জাবেদকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করে পিবিআইয়ের একটি দল।

রাফির ভাই হাসপাতালে নুসরাত জাহান রাফির ছোট ভাই ওই মাদরাসার দশম শ্রেণির ছাত্র রাশেদুল হাসান রায়হানকে অসুস্থ অবস্থায় গতকাল ফেনী ডায়াবেটিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সে অজ্ঞান হয়ে পড়লে তাকে নেওয়া হয় হাসপাতালে। চিকিৎসকরা জানান, গত কয়েক দিনের অনিদ্রা ও ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করতে না পারার ফলে রায়হান অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ ছাড়া বোনের এমন নির্মম মৃত্যু মেনে নিতে পারছে না সে।

মওদুদ বললেন, দেশে আইন-শৃঙ্খলা নেই : বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ রাফি হত্যা মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিচার সম্পন্ন করার দাবি করেছেন। তিনি বলেন, দেশে কোনো আইন-শৃঙ্খলা আর অবশিষ্ট নেই—এ ঘটনা তাই প্রমাণ করে। গতকাল বিকেলে নুসরাত জাহান রাফির সোনাগাজীর উত্তর চরচান্দিয়ার বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেন বিএনপি নেতারা। তাঁরা রাফির কবর জিয়ারত করেন। বিএনপি নেতাদের মধ্যে আরো ছিলেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লা বুলু, মোহাম্মদ শাহজাহান, আবদুল আউয়াল মিন্টু, দলের যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম) মাহবুবুর রহমান শামীম প্রমুখ।

বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের তদন্তদলও গতকাল সোনাগাজীতে এসে ওই মাদরাসার শিক্ষকদের লিখিত বক্তব্য নেয়। দলের প্রধান পরিদর্শক মোহাম্মদ বাদশাহ মিয়া ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং নুসরাত জাহান রাফির বাড়িতে গিয়ে তার ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ও বাবা এ কে এম মুসার লিখিত জবানবন্দি নেন।

ফেনী-সোনাগাজীতে মানববন্ধন দুপুরে ফেনীতে শহীদ মিনার চত্বরে মানববন্ধন করে জেলা ছাত্রলীগ। জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি এ কে এম সালাহউদ্দিন ফিরোজ কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন। ফেনী জেলা ছাত্র অ্যাসোসিয়েশন ও সচেতন নাগরিক সমাজও মানববন্ধন করেছে। সোনাগাজী উপজেলা ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ৯টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে। বিকেলে সোনাগাজী জিরো পয়েন্টে মানববন্ধন করে উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগ।

এতে বক্তব্য দেন উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জোবেদা নাহার মিলি, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সদর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সামছুল আরেফিন। সোনাগাজী বাজারের পশ্চিমে মৌলভীপাড়ায় চট্টগ্রাম সমাজের উদ্যোগে মানববন্ধন হয়।

আরও দেখুন

Sangsad

নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ বক্স রাখার সুপারিশ

স্টাফ রিপোর্টার: নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে প্রত্যেকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একটি করে অভিযোগ বক্স রাখার সুপারিশ ...

Leave a Reply

%d bloggers like this: